Wednesday, October 12, 2016
লুটপাট হচ্ছে গরিবের চাল
Wednesday, October 12, 2016 by Unknown
লুটপাট হচ্ছে গরিবের চাল
কুড়িগ্রামে
সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড পেয়েছেন
সরকারি চাকুরে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীসহ ধনী ও সচ্ছল ব্যক্তিরা,
খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে চাল, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা, অনিয়ম তদন্তে
মাঠে গোয়েন্দারা
আজিজুল হক বাস করেন দালানকোঠায়, ৭টি পুকুর লিজ নিয়ে করছেন মাছ চাষ। তিনি
কুড়িগ্রামের চিলমারি সদর ইউনিয়ন কৃষক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্বে
রয়েছেন। এরপরও হতদরিদ্রদের জন্য দেয়া সরকারে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা
কেজি চালের কার্ড তার হাতে।
ভুরুঙ্গামারি পাইকেরছড়া ইউনিয়ন
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম। তিনিও পেয়েছেন একটি কার্ড। তার
সরল স্বীকারোক্তি-‘গরিবদের জন্য দেয়া কার্ড অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তি পেয়েছেন
বলে শুনেছি।’ আপনি কেন নিয়েছেন জিজ্ঞেস করলেই জানালেন, ‘আমার নাম কিভাবে
কার্ডে এলো তাইতো আমি জানি না!’ একই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি লুত্ফর
রহমান অবশ্য নিজের নামে কার্ড নেননি। তিনি নিয়েছেন তার দুই ছেলে মিলটন ও
নাজমুলের নামে।
এই ইউনিয়নের নবাব আলী চাকরি করেন সরকারের
সমাজ কল্যাণ বিভাগে। তিনিও নাম লিখিয়েছেন হতদরিদ্রদের তালিকায়। বাদ যাননি
এই ইউনিয়নের বাবুরহাট হাইস্কুলের শিক্ষক মাহবুবুর রহমানও। অথচ এই
‘হতদরিদ্ররাই’ গরিবের চাল ১০ টাকায় নিয়ে বাজারে তা বেশি দামে বিক্রি করে
দিচ্ছেন। কিছুদিন আগে এই কুড়িগ্রামেই প্রধানমন্ত্রী খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির
উদ্বোধন করেছেন। সেখানেই সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে খাদ্যবান্ধব
কর্মসূচির এ অবস্থা দেখা গেছে।
সারাদেশ থেকে আমাদের
প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনেও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল লুটপাটের চিত্র
উঠে এসেছে। ১০ টাকা কেজির যে চাল পাওয়ার কথা হতদরিদ্রদের, তা যাচ্ছে
ক্ষমতাসীন ও ধনীদের পকেটে। এ তালিকায় বেশিরভাগই জায়গা করে নিয়েছেন
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়-স্বজন,
স্বচ্ছল কর্মক্ষম ব্যক্তি, এমনকি সরকারি চাকুরেরা। আবার তালিকায় অনেক নাম
আছে যাদের বাস্তবে অস্তিত্ব নেই। সেসব নামের বিপরীতে চাল তুলে তা আত্মসাত্
করা হচ্ছে। অনেক অসচ্ছল ব্যক্তি ১০ টাকা কেজি চালের একটি কার্ড পাওয়ার
আশায় দিনের পর দিন ঘুরে বেড়িয়েছেন এলাকার মেম্বার, চেয়ারম্যানদের দ্বারে
দ্বারে, কিন্তু পাননি। এছাড়া চাল বিক্রিতে ওজনে কম দেয়া, নির্ধারিত ৩০ কেজি
চাল না দিয়ে কম দেয়া, কার্ডধারী ব্যক্তিদের চাল না দিয়ে খোলাবাজারে
বিক্রি, ডিলার নিয়োগে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে এ
কর্মসূচিতে। তালিকা তৈরিতে অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠায় দেশের
বেশ কয়েকটি এলাকায় এখনো চাল বিক্রি শুরুই করা যায়নি।
এদিকে
বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ পেয়ে ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে খাদ্য মন্ত্রণালয়
থেকে আট সদস্যের একটি তদারকি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি অনিয়ম চিহ্নিত করে
দ্রুত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যেক
জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থাকেও অনিয়মের বিষয়ে
তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমপ্রতি
জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে ১০ টাকার চাল বিতরণে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া
গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি
দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও এই চাল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ
পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ
প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, কর্মসূচিতে কিছু অনিয়ম হয়েছে।
এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অভিযুক্তদের
বিরুদ্ধে মামলা করছি, গ্রেফতারও করা হচ্ছে। এ কর্মসূচিটি কোনো অবস্থাতেই
আমরা নস্যাত্ হতে দেব না। মন্ত্রী বলেন, এটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি
নিজস্ব কর্মসূচি। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি চলবে না।
প্রসঙ্গত, গত ৭ সেপ্টেম্বর ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’-
শ্লোগান নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচি শুরু হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র
জানিয়েছে, নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে ‘খাদ্যবান্ধব’ কর্মসূচির আওতায় দেশের
৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারকে মাসে ১০ টাকা দরে ৩০ কেজি করে চাল দেয়ার
সিদ্ধান্ত রয়েছে। প্রতি বছর মার্চ, এপ্রিল, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর-
পাঁচ মাস এ চাল দেয়া হবে।
নীতিমালায় যা রয়েছে:খাদ্যবান্ধব
কর্মসূচিতে দুস্থদের তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে,
সুবিধাভোগী পরিবারকে ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। নারী প্রধান
(বিধবা/তালাকপ্রাপ্ত/স্বামী পরিত্যক্ত) এবং যে পরিবারে দুস্থ শিশু আছে, সেই
পরিবার অগ্রাধিকার পাবে। একই পরিবারে একাধিক ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত করা
যাবে না। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাভুক্ত ভিজিডি কর্মসূচির
সুবিধাপ্রাপ্তরা এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না। উপজেলা নির্বাহী
কর্মকর্তার নেতৃত্বে জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি
থাকবে। এ কমিটিই ডিলার নিয়োগ ও হতদরিদ্র পরিবার বাছাই করবে।
বাস্তব অবস্থা:গত ৪ অক্টোবর চিলমারি উপজেলার ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডে
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণ কালে উপ-সহকারি কৃষি অফিসার সাঈদ হোসেন
আনসারি ইত্তেফাককে বলেন, ‘একই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই আছেন, এমনও আছে।
তবে এমন কার্ড পেলে আমি চাল দিচ্ছি না।’
চিলমারি থানা হাট
ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. আব্দুল ওয়াহাব ইত্তেফাককে বলেন,
রাজনৈতিক চাপ বেশি। নেতাকর্মীদের কার্ড না দিয়ে উপায় আছে। তিনি বলেন,
চিলমারি উপজেলায় ৮ হাজার ২১টি কার্ড আছে। এরমধ্যে নিজেদের নেতাকর্মীদের
মাত্র ৭০০টি কার্ড দেয়া হয়েছে।
এ উপজেলার রমনা ইউনিয়নের
সংরক্ষিত মহিলা আসনের ভাইস চেয়ারম্যান খাদিজার বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে ও
আত্মীয়-স্বজনদের কার্ড দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী
ভাইস চেয়ারম্যানের ভাগ্নে বলেন, আমি ঢাকায় চাকরি করি। মামী আমার নামে কার্ড
করে দিয়েছেন।
টাকা নিয়েও কার্ড দেননি এমন অভিযোগ রয়েছে এই
ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. আজিজের বিরুদ্ধে। এই ওয়ার্ডের বাসিন্দা
ওহিজুল ইসলাম বলেন, টাকা নিলেও মেম্বার সাহেব কার্ড দেননি। একই অভিযোগ
করেছেন চড়পত্রখাতার বাসিন্দা লোকমান, ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা কাঞ্চনমালা,
পাথরঘাটার বাসিন্দা তাছিরন ও ছালেহা।
৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা
কাঞ্চনমালা বলেন, লাভের উপর টাকা নিয়া আজিজ মেম্বারকে ৫০০ টাকা দিছি
কার্ডের জন্য। কিন্তু আমাকে কার্ড দেয় নাই। বলেছে ভিজিএফ’র ২০ কেজি চাল
দেবে।
৬৫ বছর বয়সী ছালেহা বলেন, মেম্বার, চেয়ারম্যানদের
দ্বারে দ্বারে ঘুরেও আমি একটি কার্ড পাইনি। তবে টাকা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার
করে ৯ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. আজিজ বলেছেন, আমি সবসময় এলাকার মানুষের
পাশে থেকে তাদের জন্য কাজ করছি। টাকা নেয়ার এ অভিযোগ সত্যি নয়।
এদিকে হতদরিদ্র না হওয়া সত্ত্বেও তালিকায় নাম থাকা প্রসঙ্গে কুড়িগ্রামের
চিলমারি সদর ইউনিয়নের কৃষক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আজিজুল হক বলেন, ‘আমার
৫/৭টি পুকুর থাকলেও খানেওয়ালাও আছে। আবার দলের পেছনেও খরচ আছে।’
চিলমারি উপজেলার ৪নং রমনা মডেল ইউনিয়নের রঞ্জু মিয়া পেয়েছেন খাদ্যবান্ধব
কর্মসূচির কার্ড। অথচ তার জমি চাষের টিলার আছে, আছে ধানভাঙ্গা মেশিন। রঞ্জু
মিয়া বলেন, কার্ডটি তার নামে নেয়া হয়েছে কিন্তু তিনি এ কার্ড দিয়ে চাল নেন
না। চাল নেন আরেকজন।
এ প্রসঙ্গে চিলমারি উপজেলা চেয়ারম্যান
শওকত আলী বীরবিক্রম ইত্তেফাককে বলেন, আমি অনেক চেষ্টা করেছি সত্যিকারের
হতদরিদ্রদের নিয়ে যেন তালিকাটি হয়। এজন্য আগের একটি তালিকা আমি ছিঁড়ে
ফেলেছি। তারপরও কিছু ভুলক্রুটি আছে।
হতদরিদ্রদের দেয়া চাল
নেন রৌমারি উপজেলার সদর ১ নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ইব্রাহিম। এ
প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করলেও আমি গরীব মানুষ। তাই খাদ্যবান্ধব
কর্মসূচির কার্ড নিয়েছি।’
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড
পেয়েছেন কুড়িগ্রামের আরেক উপজেলা ফুলবাড়ির নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন যুবলীগের
সভাপতি আতিকুর রহমান নয়ন, নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ
সম্পাদক শাহাজাদা খন্দকার, গজেরকুটি ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব
আলী প্রমুখ।
এসব অনিয়ম প্রসঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক খান
মো. নুরুল আমীন ইত্তেফাককে বলেন, কর্মসূচিটির উপকারভোগী নির্বাচন করছেন
চেয়ারম্যান-মেম্বাররা। যদিও কমিটিতে ইউএনও সাহেব রয়েছেন। তিনি বলেন, একজন
চেয়ারম্যান-মেম্বারই ভালো করে জানেন তার এলাকায় হতদরিদ্র ব্যক্তিটি কে?
কিন্তু তিনি যদি নিজের দলের কাউকে কিংবা অর্থের বিনিময়ে উপকারভোগী নির্বাচন
করেন তাহলে তো সমস্যা। তবে এসব অনিয়ম রোধে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর
ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমি ইতিমধ্যে ইউএনওদের সঙ্গে সভা করেছি।
যারা এসব অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িত তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
Tags:
news
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

0 Responses to “লুটপাট হচ্ছে গরিবের চাল”
Post a Comment