Friday, October 14, 2016

ঢাকার নিম্ন আদালত ও থানার মালখানা উধাও হয়ে যাচ্ছে আলামত রেহাই পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা * প্রকাশ্যেই বিক্রি হয় মালখানার মাদক

ঢাকার নিম্ন আদালত ও থানার মালখানা

উধাও হয়ে যাচ্ছে আলামত
রেহাই পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা * প্রকাশ্যেই বিক্রি হয় মালখানার মাদক
ঘটনাটি ২০০৭ সালের নভেম্বরের। পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে থেকে অটোরিকশা আরোহী শফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে আটক এবং তার কাছ থেকে এক কেজি দু’শ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। পরে শফিকুলের দেয়া তথ্যে আরও ৫শ’ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়। তখন ওই হেরোইনের মূল্য ছিল প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি দীর্ঘ তদন্তের পর পুলিশ ২০০৯ সালের ডিসেম্বর চার্জশিট দাখিল করে। এর আগে উদ্ধারকৃত আলামত হেরোইন কিনা তাও পরীক্ষা করা হয়। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ মামলার ডকেটের সঙ্গে ওই রিপোর্টটিও দাখিল করে। চার্জশিট দাখিলের সময় উদ্ধারকৃত আলামত জমা দেয়া হয় আদালতের মালখানায়। তবে মামলা চলাকালে আদালতে উপস্থাপনের পর হেরোইনের পরিবর্তে পাওয়া যায় বরিক পাউডার। ফলে খালাস পেয়ে যায় ‘মাদক ব্যবসায়ী’ শফিকুল ইসলাম। এ ঘটনায় বিচারক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মালখানার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে ভর্ৎসনা করেন। কিন্তু হেরোইনের ওই চালানটির আর খোঁজ মেলেনি।
গত বছরের ১২ এপ্রিল। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালয়েশিয়া ফেরত যাত্রী লাকি আক্তার মুক্তাকে এক কেজি সোনাসহ গ্রেফতার করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। কিন্তু আদালতে দেয়া ফরোয়ার্ডিংয়ে সোনার পরিবর্তে ২৫ বোতল ফেনসিডিল উল্লেখ করায় খুব সহজেই জামিন পেয়ে যান লাকি আক্তার। অভিযোগ রয়েছে, এজন্য আইনজীবী আর তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেয়া হয় মোটা অংকের টাকা। পরবর্তীতে প্রতারণার বিষয়টি ফাঁস হলে আদালত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ গত বছরের ১৭ নভেম্বর ধলপুরের মিষ্টিগলিতে আসামির বাড়িতে অভিযান চালায় এবং লাকি আক্তার মুক্তার পরিবর্তে তার বড় বোন মুক্তা আক্তারকে গ্রেফতার করে। দুর্ভাগ্যক্রমে দুই বোনেরই স্বামীর নাম হারুন-অর-রশিদ আর তাদের নামে আংশিক মিল থাকায় ছোট বোনের বদলে চার মাস কারাভোগ করতে হয় বড় বোন মুক্তা আক্তারকে। অন্যদিকে আদালতে আলামত হিসেবে সোনার পরিবর্তে ফেনসিডিল উপস্থাপন করা হলেও এক কেজি সোনা কোথায় গেল তার উত্তর এখনও মেলেনি।
শুধু এ দুটি মামলাই নয়, সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তার অভাব আর সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে রাজধানীর নিু আদালত ও থানার মালখানা থেকে জব্দ করা টাকা, সোনার গহনা, অস্ত্রসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামত উধাও হয়ে যাচ্ছে। আর আদালতে আলামত উপস্থাপন করতে না পারায় ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। শুধু তাই নয়, যন্ত্রাংশসহ পুরো গাড়িও উধাও হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া মালখানা থেকে অনেকটা প্রকাশ্যেই বিক্রি হয় ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবাসহ আলামত হিসেবে জব্দ করা বিভিন্ন মাদক। বিক্রির পর ফেনসিডিলের বোতলে রাখা হয় কোকাকোলা, হেরোইন হয়ে যাচ্ছে বরিক পাউডার আর ইয়াবার স্থলে রাখা হয় জন্মবিরতিকরণ পিল।

অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের যোগসাজশেই মালখানা থেকে মাদকসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল বিক্রি করা হয়। এজন্য মালখানা ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রায় ২৫ সদস্যের একটি দালালচক্র। এর সঙ্গে রয়েছেন কিছু অসাধু কর্মকর্তাও। আর কম দামে মাদক পাওয়ায় মালখানা ঘিরে বাড়ছে মাদকসেবীদের ভিড়।

ঢাকার আদালতের মালখানা দুটি- জেলা ও মহানগর মালখানা। কেরানীগঞ্জ, দোহার, সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, নবাবগঞ্জ ও জিআরপি থানায় দায়ের করা মামলায় জব্দ করা আলামত রাখা হয় জেলা মালখানায়। এখানে প্রায় ১০ হাজার বিভিন্ন ধরনের আলামত জমা আছে। অন্যদিকে, মহানগর মালখানা চার ভাগে বিভক্ত- পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন থানায়ও মামলার আলামত রাখা হয়।

জেলা মালখানা ঢাকার কালেক্টরেট ভবনের নিচতলায় আর মহানগর মালখানা মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের বেজমেন্টে অবস্থিত। টাকা, অস্ত্র ও ছোট অন্যান্য মূল্যবান আলামত মালখানার ভেতরে রাখা হয়। আর সংকুলান না হওয়ায় যানবাহনের মতো আলামতগুলো রাখা হয় আদালত চত্বর ও থানার কম্পাউন্ডে। আলামত জমতে জমতে বিচারিক হাকিম আদালতের সামনের চত্বর পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। খোলা আকাশের নিচে থাকা এসব আলামতের বেশিরভাগই রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় অবস্থিত মালখানাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের প্রায় এক লাখ আলামত রয়েছে। মালখানায় স্থান সংকুলানের অভাবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয় ও বিভিন্ন থানায় রয়েছে আরও প্রায় দেড় লাখ আলামত।

মালখানা থেকে আলামত উধাও হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আদালত পুলিশের এডিসি (প্রসিকিউশন) মিরাজ উদ্দিন বলেন, প্রতিটি আলামতে কোর্ট মালখানার রেজিস্টার নম্বর (পিএমআর) দেয়া থাকে। এরপর রিকুইজিশন অনুসারে পিএমআর নম্বর দেখে তা আদালতে উপস্থাপন করা হয়। মালখানা থেকে আলামত উধাও হওয়া কিংবা গায়েব করে ফেলার মতো কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। আদালতও এ ধরনের কোনো আদেশ দেননি। আদালত মন্তব্য না করলে আমরা কীভাবে বুঝব যে, মালখানা থেকে আলামত গায়েব হয়ে যাচ্ছে?

তবে ২০১১ সালের ২৩ এপ্রিল বহুল আলোচিত কামরুন নাহার নাদিয়া হত্যা মামলার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর নাদিয়ার স্বামী রেজার প্রাইভেটকার, স্বর্ণালংকার, মোবাইল, হত্যায় ব্যবহৃত কাঠের বাতা, কাঠের টুকরা ও নিহতের সেলোয়ার আলামত হিসেবে পুলিশ জব্দ করে। পরবর্তীতে আসামি রেজার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ২৪ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ সব আলামত তাকে দেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সাক্ষ্য গ্রহণের একপর্যায়ে জানতে চাইলে আসামি রেজা আদালতকে জানান, তিনি ‘হত্যায় ব্যবহৃত কাঠের বাতা, কাঠের টুকরা ও নিহতের সেলোয়ার’ ছাড়া সবকিছু গ্রহণ করেছেন। অথচ মালখানার নথি অনুসারে, রেজা ‘হত্যায় ব্যবহৃত কাঠের বাতা, কাঠের টুকরা ও নিহতের সেলোয়ার’ও গ্রহণ করেছেন। ফলস্বরূপ, আলামত না পাওয়ায় মামলাটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু বলেন, মামলা প্রমাণের ক্ষেত্রে আলামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলামত যাতে ধ্বংস না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর স্পেশাল পিপি আবু আবদুল্লাহ ভূঞা যুগান্তরকে বলেন, সঠিক আলামত দাখিল করতে না পারায় অনেক সময় আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক সময় বিচারও আটকে থাকছে।

জানতে চাইলে হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, আলামত সঠিকভাবে উপস্থাপনের অভাবে দোষীরা নির্বিঘ্নে মামলা থেকে খালাস পেয়ে যেতে পারে। সঠিকভাবে আলামত সংরক্ষণ না করায় কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে পোশাককর্মী সীমা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। পরে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

ফৌজদারি মামলার অভিজ্ঞ আইনজীবী প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে বলেন, মামলাটি ছিল অস্ত্রের। কিন্তু জব্দ তালিকায় থাকা বিদেশী নাইন এমএম পিস্তলের পরিবর্তে আদালতে উপস্থাপন করা হয় দেশী তৈরি পিস্তল। ফলে খালাস পেয়ে যায় আসামিরা। ২০/২২ বছর আগের আরেকটি মামলার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই মামলায় জব্দ করা জাল টাকা গায়েব হয়ে যায়। ওই ঘটনায় তৎকালীন ওসির (প্রসিকিউশন) বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছিল।

মালখানা থেকে আলামত উধাও হওয়ার বিষয়ে পুরান ঢাকার আদালতের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। যুগের পর যুগ মালখানা থেকে মাদক ছাড়াও বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র বিক্রি হয়ে আসছে। বিষয়টি কমবেশি সবাই জানে। চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পশ্চিম পাশের পান দোকানি আকবর আলী জানান, মালখানা থেকে পাচার করে আনা এক বোতল ফেনসিডিল ৬শ’ টাকা আর ইয়াবা প্রতি পিস ২শ’ টাকা করে বিক্রি হয়। অভিযোগ রয়েছে, আদালতে বিভিন্ন মামলায় হাজিরা দিতে আসা আসামিদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। জুস বা স্যালাইনের খালি প্যাকে ফেনসিডিল ঢুকিয়ে পাইপের মাধ্যমে হাজতি বা বন্দিদের দেয়া হয়। এজন্য পুলিশকে দিতে হয় বাড়তি ২০০ টাকা। আরও অভিযোগ রয়েছে, কিছু পুলিশ সদস্য এর সঙ্গে জড়িত থাকায় ফেনসিডিল ও গাঁজা কেনার জন্য নিু আদালতের মালখানাকেই নিরাপদ মনে করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা মাদক ব্যবসায়ীরা।এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আদালত পুলিশের এডিসি (প্রসিকিউশন) মিরাজ উদ্দিন জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়মানুসারে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

চুরির অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধেই : গত বছরের আগস্টে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে মাদকসহ একটি সিএনজি অটোরিকশা (ঢাকা মেট্রো-ছ-১১-০৭২৫) জব্দ করে পল্লবী থানার মালখানায় রাখা হয়। ঈদুল ফিতরের পর সেখান থেকে অটোরিকশাটি উধাও। মালখানার দায়িত্বে থাকা এসআই ইয়াকুব আলীকে অটোরিকশাটি উদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১১ নভেম্বর মিরপুর ১২নং সেকশন থেকে অটোরিকশাটি উদ্ধার এবং নূরে আলম নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে নূরে আলম বলেন, আড়াই লাখ টাকায় ওই থানার এসআই জহির উদ্দিন তৈমুর তার কাছে অটোরিকশাটি বিক্রি করেন। তখন নম্বর পরিবর্তন করে একটি ভুয়া নম্বর (ঢাকা মেট্রো-ছ-১৪-২২৪৬) বসানো হয়। ঘটনাটি এখনও তদন্তাধীন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের অপরাধ তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মিরাশ উদ্দিন বলেন, রাজধানীর ৪৯টি থানা, ডিবি, এসবি ও সিআইডি থেকে নিয়মিত বিপুল সংখ্যক আলামত মালখানায় পাঠানো হয়। কিন্তু সে তুলনায় মামলা নিষ্পত্তির হার কম। ফলে আলামত জট তৈরি হচ্ছে। স্থান সংকটের কারণে আলামত সংরক্ষণ দুরূহ হয়ে পড়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে জায়গা বরাদ্দের জন্য বলা হয়েছে। মালখানা থেকে আলামত চুরি প্রসঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা মিরাশ উদ্দিন জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। কেউ তার কাছে অভিযোগও করেনি।

Tags:

0 Responses to “ঢাকার নিম্ন আদালত ও থানার মালখানা উধাও হয়ে যাচ্ছে আলামত রেহাই পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা * প্রকাশ্যেই বিক্রি হয় মালখানার মাদক”

Post a Comment

Donec sed odio dui. Duis mollis, est non commodo luctus, nisi erat porttitor ligula, eget lacinia odio. Duis mollis

© 2013 Shotter sondhane bd news 24. All rights reserved.
Designed by SpicyTricks